নেপাল — হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এক দেশ, যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্য আর ধর্মীয় বিশ্বাস আজও জীবন্ত। সেই দেশেই রয়েছে এক রহস্যময় ও অনন্য প্রথা — “কুমারী দেবী” বা “জীবন্ত দেবী”-র পূজা। পৃথিবীর আর কোথাও এমন কোনো রীতি নেই, যেখানে এক জীবন্ত মানুষকে দেবীর রূপে পূজা করা হয়।
কুমারী দেবী হলেন এমন এক কিশোরী মেয়ে, যাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দুর্গা দেবীর জীবন্ত প্রতিরূপ বলে মনে করেন। বিশ্বাস করা হয়, দেবী দুর্গার শক্তি কিছু সময়ের জন্য মানবদেহে অবতীর্ণ হন, আর সেই মানবদেহই হলো কুমারী দেবী। সাধারণত, নেপালের নিউয়ার সম্প্রদায়ের অতি পবিত্র পরিবার থেকে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী মেয়েকে কঠোর ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে কুমারী হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
একজন কুমারী নির্বাচনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপন ও জটিল। মেয়েটিকে হতে হয় সম্পূর্ণ শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্ভুল — এমনকি তার শরীরে কোনো আঁচড় বা দাগও থাকা চলবে না। এরপর পুরোহিতরা ৩২টি গুণ বিচার করে মেয়েটিকে বেছে নেন, যা দেবীর পরিপূর্ণ রূপের প্রতীক বলে ধরা হয়। নির্বাচিত কুমারীকে রাজকীয় প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দেবীর আসনে বসানো হয়।
কুমারী দেবী একবার নির্বাচিত হলে তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাকে রাজকন্যার মতো যত্নে রাখা হয়, কিন্তু সাধারণ জীবনের স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। বাইরে যাওয়া, অন্যদের সঙ্গে খেলা বা মেলামেশা — সবকিছুতেই থাকে নিষেধাজ্ঞা। প্রতিদিন উপাসনা, দর্শনার্থীদের আশীর্বাদ দেওয়া এবং উৎসবে রাজদরবারে উপস্থিত থাকা — এই হলো তার জীবনযাপন।
যখন কুমারীর শরীরে সামান্য রক্তপাত হয় — যেমন দাঁত উঠলে বা মাসিক শুরু হলে — তখন তার দেবীত্বের সময় শেষ হয়ে যায়। তখন তাকে “অবসরপ্রাপ্ত” কুমারী হিসেবে সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
বর্তমান কুমারী দেবীর বয়স এখন ২২ বছর — তিনি একসময় ছিলেন দেবী, এখন একজন সাধারণ তরুণী। কিন্তু তার জীবনে সেই দেবীত্বের ছোঁয়া আজও রয়ে গেছে। অনেকেই বলেন, দেবীর আসনে বসার পর সাধারণ জীবনে ফেরা সহজ নয় — কারণ সমাজ ও বিশ্বাসের বাঁধন এখনও তাকে ঘিরে রাখে।